কোটি কোটি টাকা উড়তো ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে

কোটি কোটি টাকা উড়তো ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে

রাজধানীর ক্যাসিনোগুলোতে উড়ত কোটি কোটি টাকা। এসব ক্যাসিনোয় গিয়ে অনেকেই হয়েছেন সর্বস্বান্ত। অবৈধ এসব ক্যাসিনো চলেছে প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরের শহরগুলোতেও। তবে সরকারের হঠাৎ কঠোর পদক্ষেপে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বন্ধ থাকছে প্রায় সব ক্যাসিনো।

রাজধানীতে যতগুলো আধুনিক বৈদ্যুতিক ক্যাসিনো জুয়ার বোর্ড আছে, সেগুলো অপারেট করতে চীন ও নেপাল থেকে আনা হয় অভিজ্ঞ লোক। তারাই এই বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করত। বিনিময়ে প্রতি মাসে বেতন পেত তারা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব ক্যাসিনোতে প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই লোকজনের সমাগম ঘটত। জুয়ার পাশাপাশি এখানে চলত মাদকের রমরমা ব্যবসা। গত বুধবার যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ রকম চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।

ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা বা কোনো ধরনের ক্যাসিনো পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। এসবের নেপথ্যে যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। র‌্যাব অভিযান শুরু করেছে, পুলিশও অভিযান শুরু করবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ক্যাসিনোতে যারা জুয়া খেলতে আসেন তারাই মাদক সেবন করছেন। ক্যাসিনো যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেখানে মাদক সেবনও বন্ধ হবে। ক্যাসিনো বন্ধ করেও যদি কেউ মাদকের কারবার চালানোর চেষ্টা করে, তবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে ক্যাসিনো কালচার শুরু করেছিলেন সাদেক হোসেন খোকা এবং মির্জা আব্বাস। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্রাদার্স ইউনিয়নে ক্যাসিনো কালচার শুরু হয়েছিল। ব্রাদার্স ইউনিয়নের এই জুয়ার আসরে বিএনপির অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিও যেতেন। ব্রাদার্স ইউনিয়নের ক্যাসিনোর মাধ্যমেই সাদেক হোসেন খোকার উত্থান।

সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য সে সময় মির্জা আব্বাসও মতিঝিলের ক্লাবগুলো দখল করেন। তখন আরামবাগ ক্লাব ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবেও ক্যাসিনো শুরু করা হয় মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে। মির্জা আব্বাস আর সাদেক হোসেন খোকার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মোসাদ্দেক আলী ফালু মোহামেডান ক্লাবেও ক্যাসিনো শুরু করেছিলেন। তবে সেখানে ভিন্নরূপে শুরু করা হয়েছিল হাউজি ব্যবসা। ৯১-৯৬ সালে বিএনপির আমলে একমাত্র আবাহনী ছাড়া অন্য সবগুলো ক্লাবেই জুয়া-ক্যাসিনোর বাজার বসানো হয়েছিল। বিএনপির প্রভাবশালী তিন নেতার তত্ত্বাবধানেই এগুলো চলছিল।

প্রশাসনের নাকের ডগায় ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনের আড়ালে কীভাবে আইনবহির্ভূত এসব কাজ চলছিল? এমন প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।

অভিযানে এ তিনটি ক্লাব বন্ধ হলেও অভিযানের ভয়ে এমনিতেই বন্ধ করে রাখা হয়েছে মোহামেডান, আরামবাগ ও ভিক্টোরিয়া ক্লাব। মতিঝিলের তিনটি ক্লাবের একটিতে (দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব) বুধবার রাতেই সিলগালা করা হয়। বাকি দুটোতে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সিলগালা লাগানোর প্রস্তুতি চলতে দেখা যায়।

মতিঝিল ছাড়াও গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদ ক্লাবটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে ক্লাবটিতে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা মারা। ক্লাবটিতে ১৫ জন আনসার সদস্য ডিউটি করেন। তাদের থাকার জন্য জায়গাটুকু ব্যতীত ক্লাবের ক্যাসিনো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার মতো মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদের সামনে উৎসুক জনতার ভিড় চোখে পড়েনি।

কোটি কোটি টাকার ক্যাসিনো সেটাপ, নারী-পুরুষ এনে সেগুলো পরিচালনা করাসহ নানা অবৈধ কাজ চলত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ইয়ংমেন্স ক্লাবে। এত বড় আয়োজনের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ জানত না? জানলেও তারা চুপ ছিল কেন? আটকের পর র‍্যাব-৩ কার্যালয়ে নিয়ে খালেদ মাহমুদকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‍্যাব। ক্যাসিনো থেকে উপার্জনের টাকা কার কার কাছে যেত, সে নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাকে।

সূত্র জানায়, খালেদের ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থা এবং রাজনীতিক, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানতেন। তাদের ‘ম্যানেজ করে’ ক্যাসিনো চালাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।

 

কেএন/ফাস্টরিপোর্ট

Facebook Comments